ঢাকা, লোড হচ্ছে...
সংবাদ শিরোনাম
সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে চট্টগ্রামে পেশাজীবী দলের আলোচনা সভা ফজলুল হক মিলন এমপিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে এলাকাবাসীর অভিনন্দন বটিয়াঘাটায় নদী থেকে নিখোঁজ যুবকের মরদেহ উদ্ধার পীরগঞ্জে প্রাচীন মসজিদ সংরক্ষণের দাবী এলাকাবাসীর জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের ৪৮ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে সুনামগঞ্জে বর্ণ্যাঢ্য র‌্যালী ও পথসভা অনুষ্ঠিত সুনামগঞ্জে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দেয়া প্রতিশ্রুতির জমি রক্ষায় দিন মুজুরের মানববন্ধন ছয় পেরিয়ে সপ্তম বর্ষে আর.ডি.ডি.সি ভোলায় মাদকবিরোধী অভিযানে ইয়াবাসহ আটক ২ কুড়িগ্রামে ২২৫ পিস ইয়াবাসহ আটক নয়ন মিয়ার ৭ বছরের কারাদণ্ড

সুশাসনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা দুর্নীতি

#

শোয়েব হোসেন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,  12:47 PM

news image

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও মানুষের মর্যাদা অনেকাংশেই নির্ভর করে সুশাসনের ওপর। আর সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং আইনের শাসন। অথচ দুর্নীতি আজও আমাদের জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসে আছে। সচিবালয় থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, হাসপাতাল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পুলিশ স্টেশন থেকে পৌরসভা—রাষ্ট্রের বিভিন্ন দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে এর কালো ছায়া স্পষ্ট।

দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না; এটি একটি জাতির স্বপ্ন চুরি করে, মেধার যথাযথ মূল্যায়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা নষ্ট করে। এর ফলে উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত বিপুল অর্থও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত সুফল বয়ে আনতে পারে না।

আমাদের দেশে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টির নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে অভিযানও পরিচালিত হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ফল এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি। দুর্নীতি কমার পরিবর্তে অনেক ক্ষেত্রে তা নিত্যনতুন কৌশলে বিস্তার লাভ করছে। এর অন্যতম কারণ হলো—আমরা অনেক সময় সমস্যার গভীরে গিয়ে এর মূল কারণগুলো চিহ্নিত ও প্রতিরোধ করতে পারিনি। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনা এবং দুর্নীতির পেছনে থাকা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতাগুলো দূর করার ক্ষেত্রেও আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

যতক্ষণ না সমাজ দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে ঘৃণার চোখে দেখবে এবং প্রতিটি নাগরিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে এর বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে, ততক্ষণ শুধু কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি নির্মূল করা কঠিন। তাই এখন শুধু সচেতনতা সৃষ্টিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সর্বস্তরে সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ।

আমাদের আপসকামিতা, নীরবতা এবং ‘এটাই নিয়ম’ ধরনের মানসিকতার সুযোগেই দুর্নীতি অনেক ক্ষেত্রে টিকে থাকে। ঘুষ দেওয়া বা নেওয়া, অনিয়ম মেনে নেওয়া কিংবা দুর্নীতি প্রত্যক্ষ করেও নীরব থাকার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সোচ্চার হতে হবে। সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রসিদ দাবি করা, উন্নয়নকাজে অনিয়ম দেখা দিলে প্রশ্ন তোলা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা জরুরি। রাষ্ট্রের প্রতিটি দপ্তর জনগণের অর্থে পরিচালিত হয়। তাই সরকারি সেবা ও কর্মকাণ্ডের স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার দাবি জানানো নাগরিকের অধিকার।

দুর্নীতি প্রতিরোধের একক দায়িত্ব শুধু দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি দপ্তর, মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে নিজেদের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকারি সেবা প্রদান, নিয়োগ, ক্রয়প্রক্রিয়া, বাজেট বরাদ্দ এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ যতটা সম্ভব জনসম্মুখে উন্মুক্ত ও যাচাইযোগ্য করতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সততা, নৈতিকতা ও পেশাদারিত্বের চর্চা বাড়াতে হবে। যেখানে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যাবে, সেখানে দল-মত ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে দ্রুত ও নিরপেক্ষ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, একটি দপ্তরের অনিয়মও শেষ পর্যন্ত পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শিক্ষক, সাংবাদিক, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, সাংস্কৃতিককর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সমাজের অন্যান্য বিবেকবান মানুষের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে দুর্নীতিবাজদের সামাজিকভাবে বয়কট করার পাশাপাশি অভিযোগ বা সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় না করে, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার সংস্কৃতিও গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে সৎ, নীতিবান ও সাহসী মানুষদের সামাজিকভাবে উৎসাহিত ও সহযোগিতা করতে হবে।

বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই নৈতিকতা, নাগরিক দায়িত্ব ও দুর্নীতিবিরোধী মূল্যবোধের শিক্ষা জোরদার করা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে অনুসন্ধানী ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বিকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। এভাবেই আমরা আগামী প্রজন্মের মধ্যে সততা ও দায়িত্ববোধের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি।

একটি দেশকে দুর্বল করে দিতে সবসময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয় না; দীর্ঘস্থায়ী দুর্নীতিই একটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, প্রতিষ্ঠান ও মানুষের আস্থাকে ভেতর থেকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, একটি দেশকে এগিয়ে নিতে শুধু বড় বাজেট বা উন্নয়ন প্রকল্পই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সৎ নাগরিক, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ।

সুশাসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় না; এটি গড়ে তুলতে হয় রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। আর সেই পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে আমাদের পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজ থেকেই।

আসুন দুর্নীতির কাছে আর মাথা নত না করে আইনসম্মত ও শান্তিপূর্ণ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি। দুর্নীতিকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে সততা, ন্যায়বিচার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার চর্চা করি। একটি দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও সুশাসনভিত্তিক বাংলাদেশ গড়াই হোক আমাদের প্রজন্মের অঙ্গীকার।

শোয়েব হোসেন

শিক্ষক ও মানবাধিকার কর্মী

logo

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: ইমাম হোসেন