মো: আল আমিন (বিশেষ প্রতিনিধি)
১৯ মার্চ, ২০২৬, 4:34 PM
সীমানা পেরিয়ে সম্প্রীতির ঈদ
পবিত্র ঈদুল ফিতর—মুসলিম উম্মাহর জন্য এক মাসের দীর্ঘ আত্মশুদ্ধির সমাপ্তি এবং আনন্দের মহোৎসব। তবে বর্তমান বিশ্ব-প্রেক্ষাপটে এই উৎসব আর কেবল একটি নির্দিষ্ট ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই।
বর্তমানের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জাতিগত বিভাজনের বিপরীতে ঈদুল ফিতর আজ এক অনন্য মানবিক মিলনোৎসবে পরিণত হয়েছে। এবারের ঈদ সংখ্যার বিশেষ আয়োজনে আমরা তুলে ধরছি—কীভাবে ভিনদেশি ও ভিন্নধর্মাবলম্বীদের চোখে ঈদ হয়ে উঠেছে সম্প্রীতি, ধৈর্য এবং বৈচিত্র্যের এক বৈশ্বিক প্রতীক।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঈদ এখন আর কেবল অভিবাসীদের উৎসব নয়, এটি আমেরিকার মূল শক্তি—‘বৈচিত্র্য’—এর এক দুর্দান্ত প্রতিফলন। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে শুরু করে সাধারণ আমেরিকান নাগরিকদের কাছে ঈদ এক বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে বসবাসরত মাইকেল জনসন (একজন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী) বলেন, "আমার প্রতিবেশী যখন ঈদের দিন সকালে ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নামাজে যান এবং ফিরে এসে আমাদের জন্য বিশেষ মিষ্টি পাঠিয়ে দেন, তখন আমি বুঝতে পারি উৎসবের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই। এটি কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এটি আমাদের কমিউনিটিকে এক করার একটি সুযোগ।"
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিবছরই ঈদকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানানো হয় এবং হোয়াইট হাউসে আয়োজিত ঈদ ডিনার এখন স্টেট লেভেলের এক অবিচ্ছেদ্য সংস্কৃতি।
যুক্তরাজ্যে ব্রিটিশ রাজপরিবার এবং সাধারণ নাগরিকরা বিশ্বাস করেন, ঈদের আনন্দ সর্বজনীন। লন্ডনের মেয়র থেকে শুরু করে সাধারণ ব্রিটিশ নাগরিকরা মনে করেন, ঈদের মূল শিক্ষা হলো ‘সেবা’। লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে যখন হাজারো মানুষের অংশগ্রহণে ‘ঈদ ইন দ্য স্কয়ার’ পালিত হয়, সেখানে কেবল মুসলিমরাই নন, বরং হাজারো অমুসলিম পর্যটক ও স্থানীয়রা শামিল হন।
ব্রিটিশ রাজপরিবারের এক বার্তায় প্রায়ই প্রতিধ্বনি হয়—ঈদের আনন্দ কেবল উৎসবের জন্য নয়, এটি পাড়া-প্রতিবেশী এবং দুস্থদের পাশে দাঁড়ানোর এক সর্বজনীন বার্তা যা পুরো সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে। যুক্তরাজ্যে এই দিনটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং নিঃস্বার্থ সেবার এক আধুনিক মডেলে পরিণত হয়েছে।
কানাডার স্থানীয় অমুসলিম বাসিন্দাদের কাছে রমজান এবং ঈদ এক মহান শিক্ষা। টরন্টোর একজন স্কুল শিক্ষিকা সারাাহ থম্পসন বলেন, "এক মাস ধরে আমার সহকর্মীদের রোজা রাখা এবং এরপর ঈদের যে বিপুল আনন্দ—তা আমাদের শেখায় ধৈর্য কীভাবে মানুষকে আরও উদার করতে পারে।" অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক সমাজে ঈদুল ফিতর একটি ‘পারফেক্ট রিফ্লেকশন’। সেখানে সিডনি বা মেলবোর্নের ঈদ মেলাগুলোতে বিভিন্ন ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ একত্রিত হয়ে অন্যের আনন্দকে নিজের করে নেয়। এটি অস্ট্রেলিয়ার বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে ঈদের আভিজাত্য চোখে পড়ার মতো। বেদুইন আতিথেয়তার প্রতীক হিসেবে সেখানে ‘গাহওয়া’ (আরবি কফি) এবং বিশেষ মিষ্টি ‘মা’মুল’-এর প্রচলন শত বছরের পুরনো।
আবার উত্তর আফ্রিকার দেশ মিসরে ঈদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘কাহক’ (চিনিযুক্ত বিস্কুট)। দশম শতাব্দীতে ফাতেমীয় যুগে রাজকীয় কোষাগার থেকে জনগণের মাঝে স্বর্ণমুদ্রা ভরা কাহক বিতরণের যে ইতিহাস, তা আজ লোকজ উৎসবে রূপান্তরিত হয়েছে। মরক্কোর রাস্তায় যখন ‘মালহুন’ গানের সুর বাজে, তখন তা এক অপার্থিব আনন্দের আবহ তৈরি করে।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে ঈদের আবেদন সবচেয়ে বেশি আবেগপ্রবণ। এখানে ঈদের মূল আকর্ষণ শুরু হয় ‘চাঁদ রাত’ থেকে। বিশেষ করে অমুসলিম বন্ধুদের মাঝে ঈদের ‘সেমাই’ আর ‘বিরিয়ানি’ খাওয়ার যে উন্মাদনা, তা এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক।
ভারতের লখনৌ বা হায়দ্রাবাদের মতো শহরগুলোতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে ঈদের আলিঙ্গন প্রমাণ করে যে—ধর্ম আলাদা হলেও উৎসবের আনন্দ সবার জন্য সমান। ছোটদের ‘ঈদি’ বা সেলামি আদায়ের যে চিরন্তন দৃশ্য, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ অঞ্চলের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে।
বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত আর বৈষম্যের খবরের মাঝে ঈদুল ফিতর এক প্রশান্তির বারতা নিয়ে আসে। সীমান্ত পেরিয়ে ঈদের এই সম্প্রীতির বার্তা প্রমাণ করে যে, উৎসবের আনন্দ কোনো কাঁটাতারে আবদ্ধ নয়।