ঢাকা, লোড হচ্ছে...
সংবাদ শিরোনাম
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ১৩টি এয়ারগান ও গুলি জব্দ হলেও উল্লেখ নেই তালিকায় জন্মদিনের শুভেচ্ছায় সিক্ত হলেন সাংবাদিক আল আমিন দেওয়ান আল আবেদী ৪১ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে আবেগঘন বিদায় কালীগঞ্জে ফুটপাত সড়ক দখলমুক্ত করতে উপজেলা প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযান হরিপুরে ক্লাইমেট স্মার্ট কৃষি প্রযুক্তি মেলার উদ্বোধন আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের বর্জ্য থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু সিলেট থেকে উদ্ধার বালিয়াডাঙ্গীর নিখোঁজ চার স্কুলছাত্রী মৌলভীবাজারে হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে তালিকা প্রস্তুতের অভিযোগ পীরগঞ্জে সফট স্কিলস প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধন পোরশায় কম্পিউটার এন্ড নেটওয়ার্কিং প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধন

কার্লোস কাইজার: ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ‘না-খেলা’ খেলোয়াড়

#

ফয়সাল আহমেদ অনন্ত

২৭ জুন, ২০২৬,  10:02 PM

news image

এক মিনিটের জন্য মাঠে না নেমেও যিনি ফুটবলের মহাতারকা! ফুটবল ইতিহাসে এমন অসংখ্য কিংবদন্তি আছেন যারা গোল করে ট্রফি জিতে কিংবা অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে অমর হয়ে আছেন।

কিন্তু একজন আছেন যিনি কিংবদন্তি হয়েছেন ঠিক উল্টো কারণে। তিনি খেলেননি, গোল করেননি, তবুও এক যুগের বেশি সময় ধরে সবাই তাকে তারকা ফুটবলার বলেই বিশ্বাস করেছে! তার নাম কার্লোস হেনরিক রাপোসো, তবে পুরো বিশ্ব তাকে চেনে এক নামেই, কার্লোস কাইজার।

১৯৬৩ সালের ২ এপ্রিল ব্রাজিলের রিও পার্দোতে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তির আসল নাম ছিল কার্লোস হেনরিক রাপোসো। তবে জার্মান কিংবদন্তি ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের ডাকনাম "ডের কাইজার" থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজের নামের সঙ্গে জুড়ে নেন "কাইজার"। কথিত আছে, বেকেনবাওয়ারের সঙ্গে চেহারার কিছুটা মিলও ছিল তার।

⚽ স্বপ্ন ছিল তারকা হওয়ার, ফুটবলার হওয়ার নয়!

রব স্মিথকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাইজার অকপটে স্বীকার করেছিলেন, "আমি শুধু বিখ্যাত হতে চেয়েছিলাম। ফুটবল খেলার কোনো ইচ্ছাই আমার ছিল না।" এই একটি বাক্যই যেন তার পুরো জীবনের সারসংক্ষেপ।

⚽ ক্লাবের সংখ্যা নয়টি, ম্যাচের সংখ্যা শূন্য!

১৯৭৯ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত ব্রাজিল, মেক্সিকো, ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রের মোট নয়টি পেশাদার ক্লাবের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন তিনি। এর মধ্যে ছিল বোটাফোগো, ফ্লেমেঙ্গো, বাঙ্গু, ফ্লুমিনেনসে, ভাস্কো দা গামা, আমেরিকা (আরজে), মেক্সিকোর পুইবলা, ফ্রান্সের গ্যাজিলিক আজাসিও এবং যুক্তরাষ্ট্রের এল পাসো সিক্সশুটার। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, একটিও অফিসিয়াল ম্যাচে মাঠে নামেননি তিনি।

⚽ ইনজুরি ছিল তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত সতীর্থ

যে ক্লাবেই যেতেন, কয়েক দিন অনুশীলন করেই ঘোষণা দিতেন, পুরোনো চোট আবার ফিরে এসেছে। এরপর শুরু হতো দীর্ঘ চিকিৎসা, বিশ্রাম, ফিজিওথেরাপি আর ক্লাবের বেতন তোলার পালা। এক ক্লাবে একই অজুহাত বেশিদিন চলত না। তাই চুক্তি শেষ হলেই নতুন ক্লাব, নতুন গল্প, নতুন ইনজুরি!

⚽ মিথ্যারও দরকার হয় প্রচারণা!

কাইজার শুধু গল্প বানিয়েই থেমে থাকেননি। ছোট ছোট সংবাদপত্রে নিজের সম্পর্কে ভুয়া খবরও ছাপাতেন। কখনো লেখা হতো, তিনি মেক্সিকোর পুইবলায় দুর্দান্ত খেলেছেন। এমনকি মেক্সিকো জাতীয় দল থেকেও ডাক এসেছে। কিন্তু দেশের প্রতি ভালোবাসার কারণে সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন! বাস্তবে তিনি মাঠেই নামেননি।

⚽ বন্ধুত্বই ছিল তার সবচেয়ে বড় পুঁজি

কাইজারের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সামাজিক যোগাযোগ। বেবেতো, রেনাতো গাউচো, রোমারিও, তুলিও, এমনকি ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো তারকাদের সঙ্গে চলাফেরা করতেন তিনি। রিওর সমুদ্রসৈকত, নাইট ক্লাব আর জমকালো পার্টিতে তাকে নিয়মিত দেখা যেত। যখন সবাই দেখে বিশ্বসেরা ফুটবলারদের সঙ্গে একজন মানুষ ঘুরছেন, তখন আর কেউ তার খেলার প্রমাণ খুঁজতে যায় না!

⚽ ফ্রান্সেও একই কাণ্ড

১৯৮৬ সালে ফ্রান্সের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব গ্যাজিলিক আজাসিও তাকে দলে নেয়। অভিষেক অনুষ্ঠানে দর্শকদের সামনে বল নিয়ে কারিকুরি দেখাতে হবে শুনে কাইজার কী করলেন? চতুরতার সঙ্গে বলগুলো একে একে গ্যালারিতে ছুড়ে দিলেন! দর্শকরা ভাবল, এ যেন তাদের প্রতি ভালোবাসার নিদর্শন। আর তিনি বেঁচে গেলেন বল জাগলিংয়ের পরীক্ষা থেকে। তারপর যথারীতি... ইনজুরি!

⚽ জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ

১৯৮৮ সালে ব্রাজিলের বাঙ্গু ক্লাবে যোগ দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো বড় বিপদে পড়েন কাইজার। ক্লাবের সভাপতি ছিলেন ক্যাস্টর ডি আন্দ্রাদে, যার সম্পর্কে প্রচলিত ছিল, রাগ উঠলে বন্দুক বের করতেও দেরি করতেন না। দল একের পর এক ম্যাচ হারছে। সভাপতি আদেশ দিলেন, "আজ কাইজার খেলবে!" এবার তো সর্বনাশ!

⚽ মাঠে নামার আগেই লাল কার্ড!

দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামানোর প্রস্তুতি চলছিল। ঠিক তখন কাইজার বেঞ্চ ছেড়ে গ্যালারিতে উঠে দর্শকদের সঙ্গে ঝগড়া শুরু করলেন! ফলাফল? রেফারি তাকে মাঠে নামার আগেই লাল কার্ড দেখালেন। এভাবেই আবারও ফুটবল না খেলেই ম্যাচ শেষ!

⚽ কথার জাদুতে রক্ষা

ম্যাচ শেষে সভাপতি ক্যাস্টরের সামনে দাঁড়িয়ে কাইজার বললেন, "সৃষ্টিকর্তা আমার বাবাকে নিয়ে গেছেন। কিন্তু আপনাকে দ্বিতীয় বাবা হিসেবে দিয়েছেন। গ্যালারি থেকে যখন আপনার নামে অপমান শুনলাম, তখন প্রতিবাদ করা আমার দায়িত্ব ছিল।" এই আবেগঘন বক্তৃতায় ক্যাস্টরের মন গলে যায়। যেখানে চুক্তি বাতিল হওয়ার কথা, সেখানে উল্টো তার চুক্তির মেয়াদই বাড়িয়ে দেওয়া হয়! এমন কাণ্ড শুধু কাইজারের পক্ষেই সম্ভব।

⚽ না খেলেই ইউরোপ জয়!

কাইজার দাবি করেছিলেন, তিনি নাকি আর্জেন্টিনার অ্যাতলেটিকো টালেরেসের হয়ে কোপা লিবার্তাদোরেস ও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জিতেছেন। বাস্তবে ওই ক্লাবের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই ছিল না। কিন্তু এই গল্পই তাকে ইউরোপের ক্লাবে চুক্তি এনে দেয়।

⚽ রিওর 'আসল রাজা

১৯৯৫ সালে রেনাতো, রোমারিও ও তুলিওকে নিয়ে "রিওর রাজা কে?" শিরোনামে বিতর্ক হয়েছিল। সেখানে রেনাতো বিজয়ী হলেও, সমসাময়িক ফুটবলার আলেক্সান্দ্রে তোরেস বলেছিলেন, "রিওর সত্যিকারের রাজা ছিল কাইজার।" কারণ, ফুটবল না খেলেও তিনি ফুটবল তারকাদের মতোই বিলাসবহুল জীবন কাটিয়েছিলেন।

⚽ সিনেমা, বই এবং অমর এক প্রতারণার গল্প

২০১১ সালে তার কাহিনি নতুন করে আলোচনায় আসে। ২০১৮ সালে মুক্তি পায় তথ্যচিত্র "The Greatest Footballer Never to Play Football"। এতে ব্রাজিলের কিংবদন্তি কার্লোস আলবার্তো তোরেস, জিকো, বেবেতো, রেনাতোসহ অনেকেই অংশ নেন। একই বছরে সাংবাদিক রব স্মিথ একই নামে একটি বইও প্রকাশ করেন।

⚽ শেষ বাঁশি

আজও কার্লোস কাইজারের গল্প শুনলে মনে হয়, যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, এগুলো বাস্তব ঘটনা। ফুটবল মাঠে তিনি কোনো গোল করেননি, কোনো ট্রফি জেতেননি, এমনকি এক মিনিটও খেলেননি। তবু ইতিহাসে নিজের জন্য আলাদা একটি অধ্যায় লিখে ফেলেছেন। হয়তো তাই ফুটবলপ্রেমীরা মজা করেই বলেন, "ফুটবল খেলতে না জেনেও ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ফুটবলার হওয়ার নামই কার্লোস কাইজার!

logo

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক: মো: ইমাম হোসেন