তিমির বনিক (মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি)
০২ জুলাই, ২০২৬, 4:47 AM
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ১৩টি এয়ারগান ও গুলি জব্দ হলেও উল্লেখ নেই তালিকায়
মৌলভীবাজারের বড়লেখা পৌর শহরের হাজীগঞ্জ বাজারের একটি দোকানে পুলিশের অভিযানে ভারতীয় অবৈধ সিগারেটের পাশাপাশি ১৩টি বিক্রয় অনুমোদনবিহীন এয়ারগান ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয়। তবে রহস্যজনকভাবে উদ্ধার হওয়া এয়ারগান ও গুলির কোনো উল্লেখ নেই থানা পুলিশের প্রস্তুত করা জব্দ তালিকায় কিংবা এ ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে।
অথচ সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা নিজেই এয়ারগান উদ্ধারের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে কেন তা সরকারি নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি-এ নিয়ে স্থানীয় জনমনে নানা প্রশ্ন ও আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত (২৭শে জুন) রাত প্রায় ১টার দিকে বড়লেখা পৌর শহরের হাজীগঞ্জ বাজারের জামিল ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে বড়লেখা থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) প্রলয় রায়ের নেতৃত্বে পুলিশ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে ভারতীয় ২ হাজার ৮০০ শলাকা অওরিস সিগারেট, ১ হাজার শলাকা প্যাট্রন সিগারেট, ১০০ শলাকা সিগারস, ১৩টি বিক্রয় অনুমোদনবিহীন এয়ারগান এবং বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার করা হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এ সময় দোকানের মালিক জামিল আহমেদকে (৪১) আটক করে পুলিশ। মামলায় শুধু সিগারেট নেই এয়ারগান ও গুলির উল্লেখ।
ঘটনার পর এসআই প্রলয় রায় বাদী হয়ে বিশেষ ক্ষমতা আইনে জামিল আহমেদকে আসামি করে মামলা নং-২৪ (২৭শে জুন) দায়ের করেন। কিন্তু মামলার এজাহার পর্যালোচনায় দেখা যায়, সেখানে কেবল ভারতীয় অবৈধ সিগারেট উদ্ধারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ১৩টি এয়ারগান কিংবা বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধারের বিষয়ে কোনো তথ্যই উল্লেখ নেই।
অর্থাৎ প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া গুরুত্বপূর্ণ আলামতের একটি অংশ মামলার ভিত্তি থেকেই বাদ পড়ে গেছে।
আদালতে পাঠানো জব্দ তালিকা (জিডি নং-১১৩২ (২৬ জুন) পর্যালোচনায় একই চিত্র পাওয়া গেছে। জব্দ তালিকায় উল্লেখ রয়েছে, (২৭ জুন) রাত ৩টা ২০ মিনিটে উদ্ধারকৃত মালামাল জব্দ করা হয়। সেখানে 'ক', 'খ' ও 'গ' কলামে যথাক্রমে তিন ধরনের ভারতীয় সিগারেটের বিবরণ রয়েছে।
কিন্তু ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ১৩টি বিক্রয় অনুমোদনবিহীন এয়ারগান এবং বিপুল পরিমাণ গুলির উল্লেখ জব্দ তালিকায় নেই। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, যদি এসব আলামত উদ্ধারই হয়ে থাকে তাহলে তা সরকারি জব্দ তালিকায় কেন স্থান পেল না?
অভিযানের সময় উপস্থিত থাকা বড়লেখা হাজীগঞ্জ বাজার বণিক সমিতির দুই সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে জানান, পুলিশ ভারতীয় পণ্যের পাশাপাশি ১৩টি এয়ারগান ও বিপুল পরিমাণ গুলিও উদ্ধার করে।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দোকান মালিকের কাছে লাইসেন্স বা সরকারি অনুমোদনের কাগজপত্র চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। এরপর পুলিশ সিগারেটের সঙ্গে এয়ারগান ও গুলিও নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ।
তারা আরও বলেন, পরে আদালতে পাঠানো জব্দ তালিকায় এসবের কোনো উল্লেখ না দেখে তারা বিস্মিত হয়েছেন। তাদের দাবি, দোকান মালিক দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে এসব অনুমোদনবিহীন এয়ারগান ও গুলির প্রচার ও বিক্রির বিজ্ঞাপন দিয়ে আসছিলেন। অথচ পুলিশের সরকারি নথিতে এগুলোর কোনো অস্তিত্ব নেই। এ বিষয়ে তাদের বক্তব্যের অডিও রেকর্ড এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।
এক পুলিশ কর্মকর্তা তার বক্তব্যে বলেন, বিষয়টি জানতে বড়লেখা থানার উপ পরিদর্শক (এসআই) প্রলয় রায়ের হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা পাঠানো হয়। পরে তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন।
তিনি এয়ারগান ও গুলি উদ্ধারের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, "এয়ারগানে সরাসরি মামলা দেওয়া যায় না। তাই প্রথমে জব্দ তালিকায় এগুলো উল্লেখ করা হয়নি। পরে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য আদালতের কাছে লিখিতভাবে মতামত চাওয়া হয়েছে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় কোনো অভিযানে উদ্ধার হওয়া আলামত সাধারণত জব্দ তালিকায় উল্লেখ করে আদালতে উপস্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে সেই আলামত আইনগত মূল্যায়ন, অপরাধের ধরন, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধার হওয়া কোনো আলামত যদি জব্দ তালিকাতেই অন্তর্ভুক্ত না হয় তাহলে সেই আলামতের অবস্থান, সংরক্ষণ ও আইনগত ব্যবস্থাপনা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়।
ঘটনার পর থেকে বড়লেখায় বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, অভিযানে উদ্ধার হওয়া আলামত যদি সত্যিই পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে তা মামলার এজাহার ও জব্দ তালিকা থেকে বাদ পড়ল কেন?
জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও জননিরাপত্তার স্বার্থে সরকার পূর্বে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এয়ারগান আমদানি, বিক্রয়, ব্যবহার ও বিপণনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় লাইসেন্স ও সরকারি অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশে এয়ারগান বিক্রি, বিপণন বা ব্যবসা পরিচালনা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়।