নাজমুল আদনান (টাঙ্গাইল)
০১ মার্চ, ২০২৬, 8:16 AM
লাল পিঁপড়ার ডিমে চলে শত পরিবারের জীবন
টাঙ্গাইল ঘাটাইল উপজেলার পাহাড়ের জঙ্গলের গভীরে প্রতিদিনই চলে এক ভিন্নরকম জীবন সংগ্রাম। পাহাড় এলাকার বাসিন্দাদের হাতে বাঁশের লম্বা খুঁটি, কাঁধে ঝুড়ি। সকালে তারা হারিয়ে যায় গাছপালা ঘেরা পাহাড়ি বনে। লক্ষ্য একটাই-পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ। এই ডিম বিক্রি করেই চলে এদের শতাধিক পরিবারের সংসার।
স্থানীয়ভাবে একে বলে ‘মানজাইল বা লাল পিঁপড়ার ডিম।’ এপ্রিল থেকে শুরু করে প্রায় সারা বছরই পাহাড়ি বনে পিঁপড়ার বাসা ভরে ওঠে ডিমে। এ সময় সকাল হলেই স্থানীয়রা বেরিয়ে পড়েন জঙ্গলের দিকে। কেউ ওঠেন গাছের মগডালে, কেউ নিচ থেকে বাঁশের সাহায্যে পিঁপড়ার চাক ভেঙে ডিম সংগ্রহ করে। পরে সেগুলো ঝুড়িতে ভরে নিয়ে আসেন আশপাশের কোনো বাজারে। এখানে চট বিছিয়ে পিঁপড়া পরিষ্কার করে ডিমগুলো ওজন করে কার্টন ভর্তি করেন। এই ডিম দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যায়।
পাহাড়ি এলাকার পিঁপড়ার ডিম মাছের এক প্রিয় খাদ্য। অত্যন্ত লোভনীয় টোপ হিসাবে ব্যবহার করেন শৌখিন মৎস্য শিকারিরা। স্থানীয় হাটে প্রতিকেজি ডিম বিক্রি হয় ২০০০-২৫০০ টাকায়।
এলেঙ্গা টাঙ্গাইল সদর ময়মনসিংহ এলাকার বেশ কয়েকটি হাটে প্রায় প্রতিদিনই পিঁপড়ার ডিম বিক্রি হয়। সংগ্রাহকরা জানান, কাজটি কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক। কারণ ডিম সংগ্রহ করার সময় পিঁপড়ার তীব্র কামড় সইতে হয়, রয়েছে হাতি, সাপ ও মৌমাছির আক্রমণের ভয়।
মিক্তাগাছা গ্রামের সংগ্রাহক শুকুর আলী বলেন, পিঁপড়ার ডিমের খোঁজে পাহাড়ের উঁচু ডালে উঠতে হয়। পিঁপড়ার কামড়ে হাত-পা ফুলে যায়, জ্বালাপোড়া করে। তবুও পেটের দায়ে সব সইতে হয়। কারণ এ সময় এলাকায় কোনো কাজ থাকে না।
আলমগীর হোসেন নামে আরেক সংগ্রাহক জানান, একজন সংগ্রাহক দিনে গড়ে চারশ গ্রাম থেকে ১ কেজি ডিম সংগ্রহ করতে পারেন। বছরের ৪-৫ মাস পাহাড়ে সাধারণত কোনো কাজ থাকে না। এই সময় পেটের ভাত জোগাড় করতে তারা এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশা বেছে নেন।
পরিবেশবাদী সংগঠন গ্রিন ভয়েসের সদস্য রফিক মজিদ বলেন, ব্যাপক হারে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ চলতে থাকলে বনজ জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ এই ডিম বনের বিভিন্ন পাখি ও ছোট প্রাণীর প্রাকৃতিক খাদ্য। এতে প্রাকৃতিক খাদ্যের ভারসাম্য সৃষ্টি হতে পারে।
ঘাটাইল রেঞ্জ কর্মকর্তা সাব্বির গণমাধ্যমকে বলেন, ঘাটাইল পাহাগি এলাকায় প্রকৃতিনির্ভর এই জীবিকার সঙ্গে বেশকিছু পরিবার যুক্ত রয়েছে। তবে এই ধারাটি টিকিয়ে রাখতে বন সংরক্ষণ জরুরি। কারণ বন ধ্বংস হলে শুধু প্রাণী নয়, মানুষের জীবিকার পথও বন্ধ হয়ে যাবে। এই পাহাড়ের শতাধিক পরিবারের জীবন সংগ্রাম এক নীরব বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। চরম দারিদ্র্য, কর্মসংস্থানের অভাব এবং জীবন ধারণের এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ-সব মিলিয়ে তাদের টিকে থাকার লড়াই অত্যন্ত কঠিন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি এই ঝুঁকি ও মানবিক দিক বিবেচনা করে তাহলে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহের ঝুঁকিপূর্ণ জীবিকার বিকল্প হিসাবে এই মানুষদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা সরকারি সহায়তা জরুরি।