ইরফান হোসেন (পটিয়া প্রতিনিধি)
০১ মে, ২০২৬, 10:09 PM
মানবতার প্রতিচ্ছবি মুক্তিযোদ্ধা শামসুল আলম মাস্টার
পেশায় তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক—জ্ঞানদানে নিবেদিত, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং মানবিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। কিন্তু তাঁর পরিচয় কেবল একজন শিক্ষক হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না বরং তিনি ছিলেন একজন মানবদরদী, একজন সংগ্রামী নেতা এবং নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়স্থল।
তাঁর হৃদয় ছিল গরীব, অসহায় ও সর্বহারা মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায় পূর্ণ।দেশমাতৃকার টানে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।
জীবনের মায়া ত্যাগ করে তিনি লড়েছিলেন স্বাধীনতার জন্য, একটি স্বপ্নের বাংলাদেশের জন্য। স্বাধীনতার পর বহু সংগ্রাম ও প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি আবার ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তাঁর প্রিয় শিক্ষকতার পেশায়।
কিন্তু চারপাশের সমাজ বাস্তবতা—বৈষম্য, দুঃখ-কষ্ট আর বঞ্চনার চিত্র—তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। মানুষের এই কষ্ট তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি; বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের গণ্ডি তাঁর কাছে তখন খুবই সীমাবদ্ধ মনে হয়েছিল।
মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অদম্য ইচ্ছা থেকেই তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। জাসদের রাজনীতির মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হলেও তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল একটাই—সাধারণ মানুষের দুঃখ লাঘব করা, তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা।
শুধু রাজনীতি নয় ক্রীড়া ও সামাজিক উন্নয়নেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। উপজেলা ক্রীড়া সংস্থার সর্বোচ্চ পদ অলংকৃত করা, পটিয়া মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সভাপতি হিসেবে সফল নেতৃত্ব প্রদান, পেশাজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি তাঁর যোগ্যতা, দক্ষতা ও দূরদর্শিতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
পাশাপাশি চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব আজও অনুকরণীয়।
পটিয়াকে জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার দাবিতে প্রয়াত শ্রদ্ধেয় এ টি এম মুহিবউল্লাহ চৌধুরীর সঙ্গে তিনি গড়ে তুলেছিলেন শক্তিশালী গণআন্দোলন।
আশির দশকের মাঝামাঝি পটিয়াকে পৌরসভায় উন্নীত করার পেছনেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। প্রতিষ্ঠাতা মেয়র হিসেবে এবং পরবর্তীতে বারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে তিনি সবসময় অগ্রাধিকার দিয়েছেন গরীব ও সাধারণ মানুষের কল্যাণকে। তাঁর নেতৃত্বে পটিয়ায় উন্নয়ন কার্যক্রম নতুন গতি পায়।
পটিয়ার দীর্ঘদিনের দুঃখ—শ্রীমতী খালের শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণসহ নানা অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। তিনি শুধু উন্নয়ন পরিকল্পনা করেননি, বরং তা বাস্তবায়নেও ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম শামসুল আলম মাস্টার সাহেব কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের আস্থার জায়গা, বিপদের বন্ধু, ন্যায়ের কণ্ঠস্বর এবং এক অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর জীবন ছিল ত্যাগ, আদর্শ এবং মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
তাঁর অবদান, সংগ্রাম, ত্যাগ এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পটিয়াসহ সমগ্র দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তাঁর আদর্শ আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে—মানুষের জন্য কাজ করার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার।