নিশাত শাহরিয়ার
০৯ মে, ২০২৬, 9:32 AM
আওয়ামী শাসনামলে বাংলাদেশ বেতারের লাগামহীন ব্যয়ে প্রচার হয়েছিল যেসব অনুষ্ঠান
বাংলাদেশের মতো একটি উদার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বাংলাদেশ বেতারের হওয়া উচিত ছিল শক্তিশালী একটি গণমাধ্যম। কিন্তু জনগণের কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করা এবং নিরপেক্ষ তথ্য প্রবাহ নিশ্চিত করার পরিবর্তে আওয়ামী শাসনামলের দীর্ঘ ১৭ বছর বাংলাদেশ বেতার ছিল সরকারের আজ্ঞাবহ একটি প্রতিষ্ঠান।
আর বেতারের মতো একটি শক্তিশালী প্রচার মাধ্যমকে সরকারের নিজস্ব প্রচার যন্ত্রে পরিনত করতে নেপথ্যে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছিলেন অতি উৎসাহী কতিপয় উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। যাদের অনেকেই সম্প্রতি অবসরে গেছেন আবার কেউ কেউ আছেন চাকরি জীবন থেকে অবসর নেয়ার দ্বারপ্রান্তে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও তার অনুসারীদের মধ্যে বাংলাদেশ বেতারে এখনো অনেকেই রয়েছেন। যাদের মধ্যে কেউ এডি, ডিডি, ডিআরডি, আরডি থেকে শুরু করে উর্ধ্বতন পর্যায়ে পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদবীগুলোতে দায়িত্ব পালনকারী অনেকেই বিগত সময়ে ব্যাপক সুবিধা গ্রহণ করেছিলেন। তাই কিছুতেই তারা ভুলতে পারেন না আওয়ামী শাসনামলকে এবং ঐ সময়ে একচেটিয়া সুবিধাভোগকারী হাতেগোনা বেশ কয়েকজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকাকে।
আওয়ামী ফ্যাসিবাদী সরকারের সমর্থক হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সুপারিশে জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময় থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের সময়েও আওয়ামী সুবিধাভোগী অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকারা এখনো দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ বেতার।
অথচ বিগত দিনের বঞ্চিত নিপীড়িত অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকারা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আগ্রহ দেখালেও তাদেরকে ছলে বলে কৌশলে বিভিন্ন অজুহাতে নিরৎসাহিত করা হচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সময় এবং বাস্তবতা কোনটারই ধার ধারেননি বিগত আওয়ামী শাসনামলে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারকারী সুবিধাভোগী বাংলাদেশ বেতারের কর্মকর্তারা। তাদের ইচ্ছে অনিচ্ছায় চলতো বেতারের সার্বিক কার্যক্রম। বিগত সময়ের সুবিধাভোগী কতিপয় উর্দ্ধতন কর্মকর্তার সাথে যোগ দিয়েছিল বাংলাদেশ বেতারের বেশ কয়েকজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক- উপস্থাপিকা।
আওয়ামী শাসনামলের বিগত ১৭ বছর বাংলাদেশ বেতার ছিল তাদের বাবার সম্পত্তির মতো। যখন যেভাবে ইচ্ছে তারা আসতো এবং নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত না থেকেই তারা চলে যেত। সুবিধাবাদী উপস্থাপক-উপস্থাপিকারা আওয়ামী আদর্শের হওয়ায় কর্তৃপক্ষের সাথে ছিল তাদের দহরম মহরম সম্পর্ক।
অনুষ্ঠান উপস্থাপকদের মধ্যে কারো কারো নামের আগে শেখ উপাধি থাকায় নিজেকে তারা বিভিন্ন জায়গায় শেখ বংশের বংশধর হিসেবে পরিচয় দিতেও দ্বিধাবোধ করতো না। বিগত আওয়ামী শাসনামলে হাতে গোনা কয়েকজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকারাই বেতারের আশিভাগ অনুষ্ঠানে অংশ নিত। আর বাকি সব উপস্থাপক- উপস্থাপিকাদের কাজ ছিল শুধুমাত্র স্টেশন কল দিয়ে বিদায় নেয়া।
বিগত ১৭ বছরের আওয়ামী শাসনামলে যত লাইভ অনুষ্ঠান করা হতো তার সবগুলোতেই দুজন অ্যানাউন্সারের উপস্থিতি ছিল সব সময়ের জন্য। টঙ্গীপাড়া থেকে সরাসরি সম্প্রচার কিংবা মেহেরপুরের আম্রকানন থেকে কোনটাই বাদ যেত না তাদের ছাড়া। শেখ মুজিব এবং তার পরিবারবর্গকে নিয়ে অসংখ্য গান লেখা উপস্থাপকও এখন বাংলাদেশ বেতারে কাজ করছে সমান তালে।
অনুষ্ঠান উপস্থাপনা, গ্রন্থনা থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রোমোতে ভয়েস দেয়ার মানুষ যেন বাংলাদেশ বেতারে একজনই। ঠিক তেমনিভাবে বিগত সময়ে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অত্যন্ত কাছের মানুষ হওয়ায় কথিত এক নারী অ্যানাউন্সারের প্রভাবে অনেকেই থাকতো দৌড়ের উপর। তবে তার প্রভাব এখনো কমেনি বলে অভিযোগ করেছেন অনেকেই।
আওয়ামী শাসনামলের সুবিধাভোগী বেতারের কতিপয় অফিসারদের কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকারা।
জনস্বার্থের কথা না ভেবে কেবলমাত্র ব্যক্তির গুনগান প্রচারের জন্য বিগত ১৭ বছরের শাসনামলে প্রতিমাসেই লক্ষ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হতো শেখ মুজিব ও তার পরিবারবর্গসহ বিগত সরকারের শাসনামলের উন্নয়নের চিত্র। প্রতিটি অনুষ্ঠানের জন্য মোটা অংকের টাকা ব্যয় করতো বেতার কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে গোটা দেশজুড়ে এসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। আর এসব অনুষ্ঠান গ্রন্থনা ও উপস্থাপনায় ঘুরে ফিরে কাজ করতো হাতে গোনা কয়েকজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকা।
বাংলাদেশ বেতারের মতো অলাভজনক এবং সরকারি বরাদ্দ নির্ভর একটি প্রতিষ্ঠানে শেখ মুজিবকে নিয়ে যেসব অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকার মধ্যে রয়েছে----
১। বজ্রকণ্ঠ
২। ইতিহাসের মহানায়ক
৩। খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু
৪। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত গান
৫। কাব্যগীতি ও কবিতা
৬। অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে পাঠ
৭। কারাগারের রোজনামচা থেকে পাঠ
৮। আমার দেখা নয়া চীন
৯। আমাদের বঙ্গবন্ধু
১০। তরুণ প্রজন্মের চোখে বঙ্গবন্ধু
১১। স্বাধীনতার মহানায়ক
১২। বঙ্গবন্ধুর অমর বাণী
১৩। বঙ্গবন্ধুর ভাবনা
১৪। শ্রদ্ধাঞ্জলি
১৫। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ
১৬। বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা
১৭। শিক্ষার্থীদের নিয়ে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কুইজ প্রতিযোগিতা। এছাড়াও প্রচার হওয়া আরও অনেক অনুষ্ঠান রয়েছে বলে জানা যায়।
এদিকে, দিবস ভিত্তিক অনুষ্ঠানের তালিকায় ছিল--- ১০ জানুয়ারি (স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস), ১৭ মার্চ (বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস), ১৫ আগস্ট (জাতীয় শোক দিবস), ৭ই মার্চ ঐতিহাসিক ভাষণ দিবস।
তৎকালীন সরকার প্রধান শেখ হাসিনার ঘোষিত '১০টি বিশেষ উদ্যোগ' ভিত্তিক অনুষ্ঠান নিয়মিত প্রচার করতো বাংলাদেশ বেতার। ১০টি বিশেষ উদ্যোগের মধ্যে ছিল- একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ প্রকল্প, ডিজিটাল বাংলাদেশ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ইত্যাদি। এসব নিয়ে নিয়মিত ব্রান্ডিং অনুষ্ঠান প্রচার করা হতো। এটি ছিল বেতারের অন্যতম প্রধান নিয়মিত প্রচার কার্যক্রম।
বিগত সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহনকে দেশব্যাপী প্রচার করার জন্য আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্যে ছিল--
১। অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রা
২। বদলে যাওয়া বাংলাদেশ
৩। ইসলামের প্রচার ও প্রসারে শেখ হাসিনা সরকারের অবদান
৪। উন্নয়ন সরেজমিনে
৫। স্মার্ট বাংলাদেশসহ অসংখ্য অনুষ্ঠান।
বাংলাদেশ বেতারের আয়োজনে জেলা পর্যায়ের ভ্রাম্যমাণ অনুষ্ঠান "উন্নয়ন বার্তা" এবং "উন্নয়ন মেলা" অনুষ্ঠানটি ছিল বিগত সরকারের বিশেষ ব্র্যান্ডিং অনুষ্ঠান। বাংলাদেশ বেতারের একজন অনুষ্ঠান উপস্থাপক এই অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করতেন রাজধানী এবং রাজধানীর বাইরে গোটা দেশব্যাপী। তাকে বলা হতো এই অনুষ্ঠানটির মুখপাত্র। এজন্য বিশেষ সুবিধাও ভোগ করতেন তিনি। আর সেকারনে তাকে কিছুতেই ভুলতে পারেন না বেতারে কর্মরত বিগত সময়ের সুবিধাভোগী এবং সুবিধাবাদী কর্মকর্তাদের অনেকেই।
বিগত সময়ের নিপীড়িত বঞ্চিত অনুষ্ঠান উপস্থাপক উপস্থাপিকাসহ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেকেই বেশ আক্ষেপের সাথে জানান, বাংলাদেশ বেতারকে এখনো পুরোপুরিভাবে ফ্যাসিবাদমুক্ত করা সম্ভব হয়নি। ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্বারা ঘুরে বেড়াচ্ছে প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে আমাদের মাঝেই। এমন বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশ বেতারকে মুক্ত করার লক্ষ্যে
বর্তমান সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়, মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়, উপদেষ্টা মহোদয়সহ সংশ্লিষ্টদের গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী বাংলাদেশ বেতারের শিল্পী ও কলাকুশলীরা।