মেরিনা রেমি
৩১ ডিসেম্বর, ২০২৫, 11:11 PM
সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে এলজিইডি'র পিডি এনামুলের ব্যক্তিগত রাজত্ব
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীনে বাস্তবায়নাধীন 'জলবায়ু সহনীয়, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ক্ষুদ্র পানিসম্পদ উন্নয়ন প্রকল্প'-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. এনামুল কবিরের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারের অভিযোগ উঠেছে।
সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল প্রকল্পে তিনি 'ব্যক্তিগত রাজত্ব' কায়েম করেছেন বলে ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় গত ২৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিলেও এখন পর্যন্ত সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি তিনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, আগারগাঁওয়ে এলজিইডির নিজস্ব বিশাল ভবন ও পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও পিডি এনামুল কবির রাজধানীর শেওড়াপাড়ায় একটি বাণিজ্যিক ভবনে প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প অফিস ভাড়া নিয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া রাজকীয়ভাবে সাজানো এই অফিসের সাজসজ্জার নামে ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। অতিরিক্ত নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে অফিসে তিন স্তরের নিরাপত্তা গেট বসানো হয়েছে, যা সাধারণ ঠিকাদার বা সংবাদকর্মীদের জন্য প্রায় দুর্ভেদ্য।
প্রকল্পের অধীনে ৫০০-এর বেশি আউটসোর্সিং ও কনসালট্যান্ট পদে নিয়োগে বড় ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি পদের জন্য ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। বিস্ময়কর তথ্য হলো, নিয়োগপ্রাপ্তদের একটি বড় অংশই পিডির নিকটাত্মীয়।
অফিসের প্রশাসনিক কাজে কোনো সরকারি পদ না থাকা সত্ত্বেও পিডির শ্যালক ফরিদের একচ্ছত্র আধিপত্য লক্ষ্য করা গেছে। কেনাকাটা থেকে শুরু করে রক্ষণাবেক্ষণ সবই নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। সন্ধ্যার পর অফিসটিতে বহিরাগতদের নিয়ে নিয়মিত আড্ডা বসারও অভিযোগ রয়েছে।
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের এক সাধারণ পরিবার থেকে আসা এনামুল কবিরের বর্তমান সম্পদ দেখে হতবাক স্থানীয়রা। গ্রামে রাজকীয় ডুপ্লেক্স বাড়ি এবং শত শত বিঘা জমি কেনায় এলাকায় তিনি 'নতুন জমিদার' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। যাতায়াতে মাঝে মধ্যেই হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন বলেও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগে সিলেটে দায়িত্ব পালনকালেও তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল তোলার অভিযোগ উঠেছিল।
গত ২৮ অক্টোবর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মোহাম্মদ শামীম বেপারী স্বাক্ষরিত এক পত্রে ৩ দিনের মধ্যে এসব অনিয়মের ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল। নির্ধারিত সময় পার হলেও কোনো আইনি ভিত্তি বা সন্তোষজনক ব্যাখ্যা তিনি প্রদান করতে পারেননি। উল্টো দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করলে সংবাদকর্মীদের দেখে নেওয়ার হুমকি প্রদানের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা করা। তবে পিডির ব্যক্তিগত বিলাসিতা ও দুর্নীতির কারণে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই 'লুটতরাজ' বন্ধ করবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রকল্প পরিচালক এনামুল কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।