ঢাকা, লোড হচ্ছে...
সংবাদ শিরোনাম
ঐতিহ্যের মনিপুরি সম্প্রদায়ের "লাই হারাওবা" উৎসবের সমাপ্তি চা বাগানের চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত ১৬ দিন বন্ধ, ৫ শ্রমিকের মৃত্যুর অভিযোগ মদের নেশায় চা শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে বাঁধা ঘাটাইলে পুলিশের অভিযানে সাগরদিঘী বাজারে জুয়ার আসর থেকে গ্রেপ্তার ১১ মাদক সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা হবু স্ত্রীর সাথে প্রতারণা করায় হবু স্বামীকে পর্নোগ্ৰাফি মামলায় গ্রেপ্তার নেত্রকোনা রুটে বিআরটিসি বন্ধে অপচেষ্টা কালীগঞ্জ উপজেলা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর মাসিক সভা অনুষ্ঠিত ব্যারিস্টার শফিক আহমেদের মৃত্যুতে গণতন্ত্রী পার্টির শোক লালমোহন সরকারি শাহবাজপুর কলেজে শিক্ষার্থীদের সাথে পুলিশ সুপারের সচেতনতামূলক সভা

মদের নেশায় চা শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনে বাঁধা

#

তিমির বনিক (মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি)

১৪ এপ্রিল, ২০২৬,  1:57 AM

news image

প্রায় ১৭০ বছর আগে বাংলাদেশে প্রথম চা চাষ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চা উৎপাদন ও বাগানের পরিধিও বেড়েছে।

সেই ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে চা বাগানের মালিকরা তাদের নিজ প্রয়োজনে বেকারত্ব, কুসংস্কার ও মদের পাঠ্যা বসিয়ে বেড়াজালে আবদ্ধ করে রেখেছেন শ্রমিকদের।

যুগের পর যুগ মদের নেশা কাটেনি বাগানের বৃহৎ একটি অংশের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মদের পাঠ্যা বন্ধ হলে বদলে যাবে চা শ্রমিকদের জীবনমান।

দেশে বর্তমানে ১৬৭টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে চা শ্রমিক পরিবারে প্রায় ৯ লাখ মানুষ বসবাস করে। এর মধ্যে নিয়মিত ও অনিয়মিত মিলে প্রায় দেড় লাখ চা শ্রমিক। সময়ের পরিবর্তনে চা শ্রমিকের সন্তানরা উচ্চশিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।

তবে এখনো বাগানের বড় একটি অংশ কুশিক্ষা, কুসংস্কার, পাঠ্যা ও চোলাই মদে আসক্ত। বিশেষ করে মদের কারণে বেকারত্ব দূর হচ্ছে না। এখনো অনেক বাগানে প্রায় ৫০-৫৫ শতাংশ মানুষ মদ পান করে। অবশ্য যেসব বাগানে শিক্ষার হার বেশি সেসব বাগানে এর সংখ্যা কমে এসেছে।

‘যতদিন পর্যন্ত চা বাগান থেকে মদের পাঠ্যা বন্ধ করা না হবে ততদিন পর্যন্ত চা বাগানের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। নেশা ও সভ্যতা একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না। যত দ্রুত সম্ভব বাগান থেকে মদের পাঠ্যা বন্ধ করতে হবে।’

মদের পাঠ্যা বলতে সাধারণত লাইসেন্সপ্রাপ্ত বা অনুমোদিত দেশি মদের দোকান বা মদপানের নির্দিষ্ট আড্ডাকে বোঝায়। বাংলাদেশে বিশেষ করে চা বাগান এলাকায় এই শব্দটি বহুল প্রচলিত। ব্রিটিশ আমল থেকেই চা শ্রমিকদের বিনোদন বা অভ্যাসের অংশ হিসেবে বাগানগুলোতে এ ধরনের মদের পাঠ্যার প্রচলন চলে আসছে।

মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, মদের পাঠ্যা থেকে বৈধভাবে যে মদ বিক্রি হয় এরচেয়ে বেশি অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে। পাট্রা থেকে কিছু মদ কিনে এগুলোর সঙ্গে চোলাই মদ বিক্রি করা হয়। বৈধ মদ ১০০ কেজি বিক্রি হলে অবৈধ মদ ১০০০ কেজি বিক্রি হয়।

সন্ধ্যা নামলেই শুরু হয় মদ বেচাকেনা। অনেক চা শ্রমিক নেশাগ্রস্ত হয়ে নিজ সন্তান ও পরিবারের লোকজনকে নির্যাতন করেন এমন ঘটনাও ঘটছে।

মৌলভীবাজার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলায় ৯২টি চা বাগানে ৪৫টি বৈধ মদের পাঠ্যা রয়েছে। এসব পাট্রা থেকেই শ্রমিকরা মদ পান করেন।

অবৈধভাবে যারা চোলাই মদ বিক্রি করেন তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হয়। এছাড়া পুলিশ, ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে পৃথকভাবে অভিযান পরিচালনা করা হয়।

‘চা বাগানে একজন কাজ করলে চার-পাঁচজন বেকার। এ বেকারত্ব নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বাগানের ভেতর আইন অনুযায়ী একরপ্রতি নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের বিধান থাকলেও তা মানা হয় না। প্রচুর আবাদি জমি থাকা সত্ত্বেও আবাদ করা হচ্ছে না। এজন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় না।’

উচ্চশিক্ষা অর্জনকারী চা শ্রমিকের সন্তানরা জানান, যতদিন পর্যন্ত চা বাগান থেকে মদের পাট্রা বন্ধ করা না হবে ততদিন পর্যন্ত চা বাগানের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন হবে না। নেশা ও সভ্যতা একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না।

যত দ্রুত সম্ভব বাগান থেকে মদের পাঠ্যা বন্ধ করতে হবে। এই মদের নেশায় বেকারত্ব দূর হচ্ছে না। মদের লোভে বাগানের বাইরে কাজে যেতে চাচ্ছে না অনেকেই। অতি কূটকৌশলে চা বাগানে বেকারত্ব বাড়ানো ।এ বেকারত্ব নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না।

বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সদস্যরা বলেন, চা বাগানে একজন কাজ করলে চার-পাঁচজন বেকার। এ বেকারত্ব নিরসনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। বাগানের ভেতর আইন অনুযায়ী একরপ্রতি নির্দিষ্ট সংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের বিধান থাকলেও তা মানা হয় না।

প্রচুর আবাদি জমি থাকা সত্ত্বেও আবাদ করা হচ্ছে না। এজন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না। যে জমি চা চাষের জন্য অনুপযোগী সে জমি ধানচাষের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু জমির একরপ্রতি প্রায় ১১ মণ ধান কর্তৃপক্ষকে দিতে হয়।

বাগান কর্তৃপক্ষ চা শ্রমিকের পাওনা রেশন থেকে এই ১১ মণ ধানের সমপরিমাণ চাল কেটে রাখেন। অথচ এ জমি চা শ্রমিকদের নামে স্থায়ী বরাদ্দ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে তাদের জীবন জীবিকার একটি সুযোগ সৃষ্টি হতো। কিন্তু সরকার জমি বরাদ্দ কেবল চা বাগান কর্তৃপক্ষকে দেন। আর চা বাগান কর্তৃপক্ষ মন যা চায় তাই করেন শ্রমিকদের সাথে।

‘বাগান থেকে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা এখনো সৃষ্টি হয়নি। মদ ছেড়ে যদি শিক্ষার হার বাড়ানো যেত তাহলে বাগানে শিক্ষার হার অনেক বেড়ে যেত। কমলগঞ্জের আলীনগর চা বাগানে ১০০ জনের ওপর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবী কাজ করেন।’

বিভিন্ন বাগানের একাধিক চা-শ্রমিক নেতা বলেন, আমরা দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বললেই ব্রিটিশ আইনে ধরিয়ে দেওয়া হয় অভিযোগপত্র। চা বাগানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বেকারত্ব, চা শ্রমিকদের তুলনায় প্রায় চারগুণ বেশি বেকার।

সরকার এবং চা বাগান মালিকরা চাইলে এই বেকারত্ব দূর করতে পারেন। তারা এটা না করে মদের বোতল হাতে ধরিয়ে দেয়। সরকারকে এই মদের পাট্রা বন্ধ করতে হবে।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও চা শ্রমিক নেতা রামভজন কৈরি বলেন, বাগান থেকে বাইরে বের হওয়ার প্রবণতা এখনো সৃষ্টি হয়নি। মদ ছেড়ে যদি শিক্ষার হার বাড়ানো যেত তাহলে বাগানে শিক্ষার হার অনেক বেড়ে যেত। কমলগঞ্জের আলীনগর চা বাগানে ১০০ জনের ওপর বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি চাকরিজীবী কাজ করেন।

এভাবে যদি প্রতিটা বাগানে হতো তাহলে চা বাগানের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন হতো। বর্তমানে শিক্ষার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মদের হার অনেকটা কমছে বাগানে। সরকার যদি মদের পাঠ্যা বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়, তাহলে বেকারত্ব দূর হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর মৌলভীবাজারের উপপরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, মৌলভীবাজার জেলার চা বাগানে মোট ৪৫টি বৈধ মদের পাঠ্যা রয়েছে।

এরমধ্যে শ্রীমঙ্গলে একটা রয়েছে, যেখানে বিলেতি মদ বিক্রি করা হয়। অবৈধভাবে যারা চোলাই মদ বিক্রি করে তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে আইনের আওতায় আনা হয়।