তিমির বনিক (মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধি)
১৪ এপ্রিল, ২০২৬, 2:33 AM
ঐতিহ্যের মনিপুরি সম্প্রদায়ের "লাই হারাওবা" উৎসবের সমাপ্তি
মণিপুরি মৈতৈ সম্প্রদায়ের হাজার বছরের কৃষ্টি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক ‘লাই হারাওবা’ উৎসব শেষ হয়েছে। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর তেতইগাঁও মণিপুরি কালচারাল কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে তিন দিনব্যাপী এই আয়োজন শেষ হয় এক আবেগঘন ও স্নিগ্ধ পরিবেশে।
বৈশাখের বৌদ্রের তপ্ত দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই উৎসব প্রাঙ্গণ প্রাণ ফিরে পায়। গ্রামীণ পথ ধরে পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধব নিয়ে আসতে থাকেন হাজারো সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। কিশোরী ও তরুণীদের খোঁপায় ময়ূরের পেখম, পরনে রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক আর শিশুদের উচ্ছ্বাসে পুরো এলাকাজুড়ে এক জীবন্ত শিল্পকর্মে রূপ নেয়।
মেলার চারধারে মেলা নিয়ে বসা খেলনা, প্রসাধনী ও মুখরোচক খাবারের দোকানগুলো উৎসবের প্রাণচাঞ্চল্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল ‘লাই হারাওবা জগোই’। মাইবি বা নারী পুরোহিতদের নেতৃত্বে নারী, কিশোরী ও শিশুরা নৃত্যের মাধ্যমে তুলে ধরেন সৃষ্টিতত্ত্ব, প্রকৃতি ও মানবজীবনের বিবর্তন।
আয়োজকদের মতে, ‘লাই’ অর্থ দেবতা এবং ‘হারাওবা’ মানে আনন্দ অর্থাৎ এটি দেবতাদের আনন্দোৎসব। সুর,তাল ও মুদ্রার নিখুঁত সমন্বয়ে এই নৃত্য কেবল পরিবেশনা নয়, বরং এক পবিত্র প্রার্থনায় রূপ নেয়, যা উপস্থিত দর্শকদের বিমোহিত করে তুলে।
শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই উৎসব মণিপুরি জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মেরুদণ্ড হিসেবে টিকে আছে। উৎসব স্টিয়ারিং কমিটির সদস্য রবি কিরণ সিনহা (রাজেশ) বলেন, “এটি শুধু একটি উৎসব নয়, আমাদের অস্তিত্বের অংশ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমরা এই ঐতিহ্য বহন করে চলেছি।”
সদস্য সচিব ওইমান লানথই জানান, লাই হারাওবা প্রকৃতি ও মানুষের আত্মিক সম্পর্কের এক গভীর প্রতিফলন। অন্যদিকে, আহ্বায়ক ইবুংহাল সিনহা (শ্যামল) বলেন, মাইবিদের এই নৃত্য নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার প্রধান মাধ্যম।
ইউনেসকো বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সহযোগিতায় আয়োজিত এই উৎসব বর্তমানে আন্তর্জাতিক গুরুত্ব লাভ করেছে। আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও ঐতিহ্য কীভাবে স্বমহিমায় টিকে থাকতে পারে, ‘লাই হারাওবা’ তারই এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে ফুটে তুলে। ধর্ম, প্রকৃতি ও বিশ্বাসের এই মেলবন্ধনে মেলা বাংলাদেশের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি হিসেবে সমাদৃত হচ্ছে।