মনির হোসেন (উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ বেতার)
২৯ নভেম্বর, ২০২৫, 11:26 PM
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও বেগম খালেদা জিয়া
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সর্বাধিক প্রভাবশালী নারী নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। তার এই সংকটপূর্ণ মুহূর্তে পুরো দেশ গভীর উদ্বেগে নিমজ্জিত, আন্তর্জাতিক মহলও ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে।
বহু বছর ধরে রাষ্ট্র- রাজনীতির প্রান্তে অবিরাম নিপীড়ন, ব্যক্তিগত শোক, শারীরিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের পরও যে নেত্রী বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন—তিনি আজ আবারও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, বিএনপির অস্তিত্ব এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের দিকনির্দেশনায় তার অবস্থান যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ—বর্তমান পরিস্থিতি তা আবারও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রধান স্তম্ভ বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে হাসপাতালের আইসিইউতে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছেন।
মাত্র দুই দিন আগে তার পরিবারের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যায় — তার হাত অস্বাভাবিকভাবে ফোলা, যা দেখে অনেকেই ধারণা করেন তার শারীরিক অবস্থা গুরুতর। এই এক ছবিই দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। কারণ বহু বছর ধরেই বেগম জিয়া নানা শারীরিক জটিলতা, রাজনৈতিক নির্যাতন ও নিপীড়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।
তার জীবনের পথচলা শুধু রাজনৈতিক উত্থান-পতনেই ভরা নয় রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত বেদনাও। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে তিনি হারিয়েছেন সেনা অভ্যুত্থানে। হারিয়েছেন সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর অকাল মৃত্যুতে যে শোক এখনও তার চোখের গভীরে লেগে আছে। বৃদ্ধ বয়সে তাকে বহু মাস কারাবরণ করতে হয়েছে।
করোনার সময়ে গুরুতর সংক্রমণের ভিতর দিয়ে তাকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসতে হয়েছে। চিকিৎসার সুযোগেও রাজনৈতিক বাধা এসেছে বহুবার। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো নেত্রীকে এত প্রাতিষ্ঠানিক ও পদ্ধতিগত নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে বলে খুব কম উদাহরণ পাওয়া যায়।
২০২৩ সালে ঘটে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। একটি বড় সরকারি সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর হঠাৎ কয়েকটি মিডিয়া হাউজে ফোন করে জানায়—“বেগম খালেদা জিয়া মারা গেছেন।” খবরটি এত বিশ্বাসযোগ্য জায়গা থেকে এসেছিল যে সন্দেহের অবকাশ ছিল না।
কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পর বলা হলো—“এটি ছিল একটি টেস্ট কেস।” অর্থাৎ, বেগম জিয়ার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে বিএনপি এবং জনসাধারণের প্রতিক্রিয়া কেমন হয় তা যাচাই করার জন্য এই তথ্য ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়েছিল মানবিকতার সব সীমা অতিক্রম করে একটি জীবিত, অসুস্থ, বয়স্ক নেত্রীর মৃত্যু নিয়ে এমন পরীক্ষা—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন।
২০১৫ সালে একটি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল—বেগম জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে পারবেন কি না?তখনকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জবাবে বলেন—“তাহলে ফালুর কী হবে?” এমন সংবেদনশীল বিষয়ে করা মন্তব্যটি এবং সেই সময়ে তার হাসি —রাজনৈতিক শিষ্টাচারের চরম সংকটের উদাহরণ হয়ে থাকে।
জাতির দুই শীর্ষ নেত্রীর মধ্যে এই ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক উত্তাপ দেশকে বহুবার অস্থিতিশীল করেছে, যা আজও চলমান বাংলাদেশ এখন এক গভীর সংকটময় রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।অর্থনীতি, শাসনব্যবস্থা, গণতন্ত্র—সবই অনিশ্চয়তার মধ্যে।
এ সময়ে বেগম খালেদা জিয়া অনেকের কাছে “বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের শেষ জীবন্ত প্রতীক”। তিনি দীর্ঘদিন রাজনীতির বাইরে থাকায় বিএনপি আজ দিশেহারা এবং তার হঠাৎ কোনো অসুস্থতা বা দুঃসংবাদ দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা।
দেশের ভবিষ্যৎও এতে হুমকির মুখে পড়তে পারে। বেগম জিয়া বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। রাজনৈতিক নির্যাতন, বন্দিত্ব, নিদারুণ রোগযন্ত্রণা—সবকিছু সত্ত্বেও তিনি যে স্থিতধীভাবে লড়ে গেছেন, তা অনেকের কাছে তার ব্যক্তিগত শক্তির প্রতীক।
আজ যখন তিনি আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছেন, তখন পুরো দেশ তার সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছে। তার ভক্ত-সমর্থকরা বিশ্বাস করেন— এই ঝড়ও তিনি পার হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন।
দেশের উপর দিয়ে যত ঝড় গেছে, বেগম জিয়ার জীবনে তার চেয়েও বেশি ঝড়-বৃষ্টি নেমে এসেছে। তবুও তিনি লড়ে গেছেন, উঠে দাঁড়িয়েছেন। আজ আমরা আবারও তার সুস্থতার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করছি।
তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ফিরে আসুন এবং দেশের রাজনীতিকে আবারও সাহসের পথে ফিরিয়ে আনুন।
মোঃ মনির হোসেন
উপ-পরিচালক
বাংলাদেশ বেতার, ঢাকা।