নিশাত শাহরিয়ার
০২ অক্টোবর, ২০২৫, 5:31 AM
নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নিরাপদ আবাসস্থল যাত্রাবাড়ীর 'নিউ পপুলার প্যালেস' আবাসিক হোটেল
জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীসহ অত্র এলাকার আশপাশে বসবাসরত নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ ও তাদের ঘনিষ্ঠদের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে যাত্রাবাড়ীর নিউ পপুলার প্যালেস আবাসিক হোটেল।
জানা যায়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ী এলাকার শহীদ ফারুক সড়কে অবস্থিত ইউনুস সুপার মার্কেটের চতুর্থ তলায় পুরো ফ্লোর ভাড়া নিয়ে আবাসিক হোটেলের আঁড়ালে স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ছাত্রীসহ গার্মেন্টসের নারী কর্মীদের নিয়ে প্রকাশ্যে পতিতালয় খুলে বসেছে জামান, সাইদুল ও বিল্লাল গং।
এই হোটেলের কিছু চিহ্নিত দালাল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নারীদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসে। এরপর আপত্তিকর ছবি তুলে তাদের ব্ল্যাকমেইল করে দিনের পর দিন দেহ ব্যবসায় বাধ্য করা হয়। দালাল এবং কর্মচারীদের কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনি ভেদ করে অসহায় এই নারীরা আর মুক্ত হতে পারেনা।
বেঁচে থাকার প্রতিটা মুহূর্তে লালসার শিকার হতে হয় নানা বয়সী খদ্দেরদের। শুধু তাই নয় বহুল আলোচিত- সমালোচিত যাত্রাবাড়ীর নিউ পপুলার প্যালেস নামের এই আবাসিক হোটেলে চলে বিভিন্ন রকম মাদকের রমরমা ব্যবসা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইউনুস সুপার মার্কেটের বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থানকারী হোটেলের দালালেরা উঠতি বয়েসী মেয়েদের মোটা অংকের টাকায় ঢাকায় চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কৌশলে এই হোটেলে এনে বিক্রি করে দেয়। এরপর এইসব অসহায় গরীব মেয়েদের দিয়ে জোরপূর্বক দেহ ব্যবসা পরিচালনা করে হোটেল ম্যানেজার তারেক, বিল্লাল ও তার সঙ্গীরা।
অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এই আবাসিক হোটেলে। হোটেল ম্যানেজার বিল্লালের সহযোগিতায় নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের কাছে নিউ পপুলার আবাসিক হোটেল যেন রাজধানীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
অথচ রাস্তার অপর পাশেই রয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা। এই হোটেলটিতে মাদক ও দেহ ব্যবসা নিয়ে গণমাধ্যমে বেশ কয়েকবার প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলেও কার্যকরী কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সক্ষম হয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পরিচয় গোপন করে হোটেল ম্যানেজার বিল্লালের সাথে কথা বলে জানা যায়, হোটেল পরিচালনায় এলাকার প্রভাবশালী মহলসহ আইনশৃংখলা বাহিনীকে প্রতিমাসে মোটা অংকের টাকা দেয়া হয়। যার ফলে এই হোটেলটির বিরুদ্ধে শত অভিযোগ করা হলেও তাদের ব্যবসার উপরে কোন প্রকার প্রভাব পড়ে না বলে জানান তিনি। কারা কারা এই টাকার ভাগ পায় জানতে চাইলে কৌশলে প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান হোটেল ম্যানেজার বিল্লাল।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নিউ পপুলার প্যালেস আবাসিক হোটেলটিতে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের অবাধে যাতায়াত, মাদক ও দেহ ব্যবসার কারণে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে তাদের।
সাংবাদিক পরিচয় জানার পর উক্ত মার্কেটের কয়েকজন দোকানদার ভয়ে পরিচয় গোপন রাখার শর্তে জানান, এখানে যারা আসেন গোপন ক্যামেরায় তাদের আপত্তিকর মুহুর্তের ভিডিও করে রাখা হয়। পরবর্তীতে ব্ল্যাকমেইল করে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেয় ম্যানেজার বিল্লাল ও তার সঙ্গীরা। এই যখন বাস্তবতা তখনো নিশ্চুপ পুলিশ প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা।
ইউনুস সুপার মার্কেটে বাজার করতে আসা কয়েকজন অভিভাবকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা বেশ চিন্তায় থাকেন তাদের সন্তানদের নিয়ে। কেননা তাদের সন্তানদের বেশিরভাগই যাত্রাবাড়ী এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পড়াশোনা করছে। অত্র মার্কেটের বিভিন্ন জায়গায় নিউ পপুলার প্যালেস আবাসিক হোটেলের ভিজিটিং কার্ড পড়ে থাকে। যাত্রাবাড়ি এলাকার বিভিন্ন সড়কে অত্র হোটেলের অসংখ্য ভিজিটিং কার্ড ফেলে রাখা হয়। এতে করে রাস্তায় চলাচলরত সাধারণ মানুষ যেমন বিব্রত হন তেমনি সন্তানরা কোনভাবে বিপথে যায় কিনা তা নিয়ে মারাত্মক টেনশনে থাকেন অভিভাবকেরা। এমন বাস্তবতায় হোটেলটি একেবারে বন্ধ করে দেয়ার ব্যাপারে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, সচেতন মহলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সার্বিক সহযোগিতা ও গঠনমূলক পদক্ষেপ কামনা করেন অত্র এলাকার সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা।
এ ব্যাপারে যাত্রাবাড়ী থানায় যোগাযোগ করা হলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানানো হয়। দীর্ঘ সময় ধরে নিউ পপুলার প্যালেস আবাসিক হোটেলে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের অবাধ যাতায়াত, মাদকের রমরমা ব্যবসাসহ দেহব্যবসা চলমান রয়েছে। এলাকাবাসী বলছে, হোটেলটি বন্ধ করে দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এজন্য প্রশাসনের সহযোগিতা কামনা করেন তারা।